আর্সেনিক দূষণ ও তার প্রতিকার

আর্সেনিক এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ । যার কোনাে বর্ণ , গন্ধ , স্বাদ নেই । ধূসর আভাযুক্ত এটি একটি উপধাতু , যার রাসায়নিক সংকেত As । এর পারমাণবিক সংখ্যা ৩৩ , পারমাণবিক ভর ৭৪.৯২ । আর্সেনাইট ও আর্সেনেটে নামক দু’টি বিষাক্ত যৌগ মিলে এটি গঠিত । সব ক্ষেত্রেই আর্সেনিক জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয় । তবে তা পানির সাথে মাত্রাতিরিক্ত মেশার পর বিষাক্ত রূপ ধারণ করে । আর্সেনিক দূষণ হলো আর্সেনিক এক ধরনের বিষ । এ বিষ পানির সঙ্গে মিশে থাকে । মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলে মানুষ আর্সেনিকোসিস রােগে আক্রান্ত হয় । বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ( WHO ) – এর রিপাের্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রতি লিটার খাবার পানিতে ০.০৫ মি . গ্রাম আর্সেনিকের মাত্রা সহণীয় । কিন্তু এই পরিমাণের চেয়ে বেশি মাত্রার আর্সেনিক পানিতে থাকলে সেই পানি মানুষের জন্য ক্ষতিকর । এ পানি পান করলে মানুষের ভয়াবহ মরণ ব্যাধি হয় । তাই এই মরণ ব্যাধি হতে সর্বদা সচেতন থাকতে হবে ।

আর্সেনিক দূষণ ও তার প্রতিকার

আর্সেনিকের উৎস

মানবদেহে , সমুদ্রে ও মাটির উপরিভাগে স্বাভাবিক পরিমাণ আর্সেনিক থাকে । কিন্তু মাটির নিচে মাত্রার অতিরিক্ত আর্সেনিক থাকে । ফাইরাইটস নামক যৌগ মাটির নিচের পাথরের মধ্যে আর্সেনিককে ধরে রাখে । আর্সেনিকের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে শিলামণ্ডলে ও ভূ – ত্বকে । আর্সেনিকের মূল উৎস হচ্ছে আর্সেনিক অক্সাইড , আর্সেনিক সালফাইড এবং আর্সেনাইড । মাটির নিচ থেকে ভূ – রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে আর্সেনিক নিজস্ব আস্তানা থেকে বেরিয়ে পানির সাথে মিশে যায় । তারপর পাম্প অথবা নলকূপের সাহায্যে পৃথিবীর উপরিভাগে উঠে আসে ।

বাংলাদেশে আর্সেনিকের বর্তমান অবস্থা

আর্সেনিক একটি মারাত্মক পরিবেশ দূষণকারী পদার্থ । এটি বর্তমানে বাংলাদেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে । এই পরিবেশ দূষণকারী পদার্থের কবলে পরে অসংখ্য মানুষ এখন আর্সেনিকোসিস নামক রােগে আক্রান্ত হচ্ছে । বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলই বর্তমানে আর্সেনিকের কবলে । বাংলাদেশের মানুষ আগে নদী – নালা , খাল – বিলের পানি অনায়াসে ব্যবহার করত । এমনকি সামান্য গভীর নলকূপের পানি পান করেও জীবন বাঁচিয়ে রাখত । কিন্তু সেই পানি আজ জীবনঘাতি বিষে পরিণত হয়েছে । কেউ জেনে কেউ না জেনে এই বিষাক্ত পানি পান করছে । তারপর ধীরে ধীরে এই বিষ মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে । আর্সেনিক বিষাক্রান্ত রােগী কখনাে সুস্থ হয় না । কারণ এ রােগের কোনাে ওষুধ নেই

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে প্রথম পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর রূপপুর গ্রামে আর্সেনিকের রােগী শনাক্ত করা হয় । চাঁদপুর , মুন্সিগঞ্জ , গােপালগঞ্জ , মাদারীপুর , নােয়াখালী , সাতক্ষীরা , কুমিল্লা ও বাগেরহাটে আর্সেনিকের মাত্রা সবচেয়ে বেশি । আর উত্তর বঙ্গের জেলাগুলােতে যেমন ঠাকুরগাঁও , পঞ্চগড় , নীলফামারী , নাটোর , লালমনিরহাটসহ পটুয়াখালী ও বরগুনায় আর্সেনিকের মাত্রা সহনীয় ।

আর্সেনিকের লক্ষণ

প্রতিটি রােগের কিছু কিছু লক্ষণ দেখা যায় । তেমনি আর্সেনিকোসিস রােগেরও কিছু কিছু লক্ষণ দেখা যায় , যা দেখে এ রােগ নির্ণয় করা সম্ভব হয় । আর্সেনিক আক্রান্ত রােগীদের হাত ও পায়ের তালুতে এক ধরনের গুটি দেখা দেয় । শরীরে ও হাতের তালুতে কালাে ও বাদামি ছাপ দেখা দেয় । হাতে ও পায়ের গুটিতে অসহ্য যন্ত্রণা হয় । শরীরের চামড়ায় হালকা চুলকানি হয় , চামড়া ফেটে যায় , লালচে পানি বের হয় , অসহনীয় ব্যথার সৃষ্টি হয় । পেট ব্যথা ও কাশি হতে পারে । চোখের মণি সাদা হয়ে যায় , চোখ দিয়ে সারাক্ষণ পানি ঝরতে থাকে । যৌনাঙ্গে ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে ক্যান্সারে পরিণত হতে পারে ।

আর্সেনিক প্রতিকারের উপায়

আর্সেনিক একটি ভয়াবহ বিষ । এর ফলে সৃষ্ট আর্সেনিকোসিস রােগের তেমন কোনাে চিকিৎসা নেই । তাই একবার এ রােগ হলে আর ভালাে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না । তবে এ মরণব্যাধি হতে রক্ষা পেতে হলে প্রতিরােধক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে । আর্সেনিক প্রতিকারে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে । গ্রামে – গঞ্জের প্রতিটি টিউবয়েলের পানি পরীক্ষা করে চিহ্নিত করতে হবে । সবুজ রং লাগানাে টিউবয়েলের পানি পান করতে হবে এবং লাল রং লাগানাে টিউবয়েলের পানি বর্জন করতে হবে । আর্সেনিক সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে ।

পানিকে আর্সেনিক মুক্ত করতে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানির প্লান্ট তৈরি করতে হবে । বালি – শশাধিত জলাধার সৃষ্টি করতে হবে । সারা বছর ব্যবহার করার জন্য বড় জলাধারে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ব্যবহার করতে হবে । আর্সেনিক কবলিত এলাকায় বােররা ধানের চাষ বন্ধ করে বসন্তকালীন ফসল ( রবিশস্য ) ও হেমন্তকালীন ফসল ( খরিফ শস্য ) চাষ করতে হবে । দেশি ও বিদেশি চিকিৎসকদের নিয়ে সরকারি উদ্যোগে হাসপাতাল তৈরি করতে হবে । আর্সেনিক আক্রান্ত রােগীর দেহে প্রাথমিক অবস্থায় রােগ শনাক্ত করতে পারলে রােগীকে আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ পানি পান ও ব্যবহার করতে হবে । আর্সেনিক আক্রান্ত রােগীকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে ।

“ পানিকে করিতে শুদ্ধ

আর্সেনিকের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ । ”

এ স্লোগানটি সামনে রেখে আমাদের আর্সেনিক প্রতিরােধের চেষ্টায় নামতে হবে । বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে আর্সেনিক এখন মরণব্যাধি রূপ ধারণ করেছে । পানির অপর নাম জীবন । পানি পান না করে মানুষ বাঁচতে পারে না । এই পানিতেই মিশে আছে আর্সেনিক । তাই পানি পান করার ক্ষেত্রে আমাদের সচেতন থাকতে হবে । পরীক্ষা করে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে এবং আর্সেনিক প্রতিরােধে সচেষ্ট হতে হবে ।

Leave a Reply