কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রয়োগ

শাব্দিক অর্থে বিশেষ জ্ঞানই হলাে বিজ্ঞান । বৈজ্ঞানিক মনন থেকে মানুষ লাভ করে অন্ধবিশ্বাসের মৃঢ়তার প্রতি অশ্রদ্ধার চেতনা । বর্তমান যুগ পুরােটাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন । সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মানুষের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিজ্ঞান জড়িত । বিজ্ঞানের অসীম শক্তিতে মানুষ আজ প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে ; সমগ্র পৃথিবীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে । বিজ্ঞান বিচিত্র বিশ্বের বিস্ময়কর বার্তাবাহী , মানুষের দেহ ও মনের সামগ্রিক পূর্ণতা দানকারী এবং জীবন ও অজগতের রহস্যরাজ্য উদ্ঘাটনকারী । বহুমাত্রিক উৎকর্ষ সাধনে একুশ শতকের বিজ্ঞানের এ জগৎ ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে মানুষকে পৌছে দিয়েছে আধুনিক সভ্য ইতিহাসের মনিকোঠায় ।

কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রয়োগ

মানবজীবনে কৃষির অবদান

মানুষের জীবনে খাদ্যের নিরাপত্তা বিধানে কৃষির ভূমিকা অনির্বচনীয় । পৃথিবীতে মানুষ কৃষিকাজ দিয়েই জীবনের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল এবং এখনাে কৃষির ওপর নির্ভর করেই মানবজীবনের উত্তরােত্তর প্রগতিশীল ধারা অব্যাহত রয়েছে । পৃথিবীর বহুদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর । কৃষি শিল্পের প্রাণ , সভ্যতার ভিত এবং জাতীয় উন্নয়নের চাবিকাঠি । প্রাচীনকাল থেকে আজ অবধি একমাত্র কৃষিই মানবজাতির জীবন সংগ্রামে তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে ; দিয়েছে নিশ্চিত গৌরব মুকুট । তাই মানুষের ধারাবাহিক অগ্রগতি ও প্রয়ােজনের কথা বিবেচনা করে কৃষিক্ষেত্রে অনবরত গবেষণা চলছে । ফলে বিশ্বের উন্নত দেশগুলাে তাদের কৃষিক্ষেত্রে বহুল বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করে চলেছে । বাংলাদেশের কৃষির অবস্থা : মাটি , পানি , এবং মানব সম্পদ- এই তিনটি আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ । এই ত্রয়ী সম্পদের সর্বোত্তম সমস্থিত ব্যবহারের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আর্থ – সামাজিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি । আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান । এদেশে । শতকরা ৮০ জন লােক কৃষিজীবী । উন্নয়নশীল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সম্পূর্ণ কৃষির ওপর নির্ভরশীল । স্বাধীন – সার্বভৌম বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে , বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে । গড়তে হলে , সর্বাগ্রে চাই কৃষিক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব । কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলাে এই , উন্নত দেশসমূহে কৃষিকর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠলেও আমাদের দেশে এখনাে তেমন কোনাে অগ্রগতি সাধিত হয়নি ।

কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব বয়ে আনার জন্য প্রথমেই কৃষিকাজের মহানায়ক কৃষকের জীবন এবং তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ পরিবর্তন করতে হবে । কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে , কৃষি বাচলে আমাদের দেশ বাঁচবে । কাজেই দেশের উন্নয়নে এবং কৃষকের ভাগ্যের উন্নয়নে আমাদের অপরিহার্যভাবে কৃষিক্ষেত্রে । যন্ত্রপ্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে হবে ।

কৃষির আধুুনিকায়নের বিজ্ঞান

কৃষির আধুনিকায়নে বিজ্ঞান ও কৃষি হচ্ছে একটি পরিবর্তনশীল বিজ্ঞান । নিত্য নতুন প্রযুক্তির সংযােজন ও উদ্ভাবন পদ্ধতির বৈভবে । বর্তমান বিশ্বে কৃষি সবচেয়ে অধিক আকর্ষণীয় পন্থা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে । কৃষিক্ষেত্রে রয়েছে বিজ্ঞানের চর্চা ও গবেষণার অফুরন্ত সুযােগ , জনকল্যাণে আত্মনিবেদনের উন্মুক্ত পরিসর , দারিদ্র বিমােচনে কাজ করার অনুকূল পরিস্থিতি , প্রজ্ঞা ও মেধা বিকাশের বিশাল ক্ষেত্র । পরিবর্তনশীল কৃষি প্রযুক্তিতে প্রতিনিয়ত রূপান্তরিত হচ্ছে কৌশল , বদল হচ্ছে পদ্ধতি । এই পরিবর্তনকে কৃষক , কৃষিজীবী , কৃষিবিদ , কৃষি গবেষক , কৃষি সংগঠক এবং কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত বৃহৎ বণিক শ্রেণিকে দ্রুত ও সর্বদা অবহিত রাখতে হলে প্রয়ােজন গণমাধ্যমের নিবিড় ও একান্ত সহযােগিতা । আজ বিজ্ঞানের প্রভাবে কৃষিকার্য আদিম স্তর কাটিয়ে আধুনিক স্তরে পৌঁছেছে । অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ এবং উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কৃষিবিপ্লবের মাধ্যমে কৃষির আধুনিকায়নের সূচনা ঘটেছে । এর ফলে কৃষকেরা কৃষিকাজে ব্যবহৃত উন্নত ধরনের যন্ত্রপাতির কৃষি পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হয় । কাঠের লাঙলের পরিবর্তে মানুষের হাতে চলে আসে লৌহসৃষ্ট কলের লাঙল ট্রাক্টর , পাওয়ার টিলার ইত্যাদি । সনাতনী সেচ ব্যবস্থায় এখন ব্যবহার করা হয় বিদ্যুৎ শক্তিচালিত পাম্প ।

বিজ্ঞানীরা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় আকাশ হতে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে কৃষিক্ষেত্রে কল্পনাতীত অগ্রগতি অর্জন করেছে । উন্নতজাতের হাইব্রিড বীজ উৎপাদনে বিজ্ঞান কৃষিক্ষেত্রে যে অবদান রেখেছে তাও বিস্ময়কর । এসব বীজ সাধারণ বীজের তুলনায় ফসল উৎপাদনে তুলনামূলকভাবে সময় কম লাগে এবং তা উচ্চফলনশীল । সাম্প্রতিকালে বিশ্বের মরু অঞ্চলে চাষাবাদের প্রচেষ্টাসহ কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বহুমাত্রিক জয়যাত্রা , দিন দিন দ্রুত ত্বরান্বিত হচ্ছে । বর্তমানে শীতপ্রধান দেশে গ্রিনহাউস প্রক্রিয়ায় শাক – সবজির চাষ করা হচ্ছে , তেমনি গ্রীষ্মপ্রধান দেশে কৃত্রিম ঘরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে শীতকালীন সবজির উৎপাদনও সম্ভব হচ্ছে ।

উন্নত দেশসমূহে কৃষিকার্যে বিজ্ঞান

সম্পূর্ণ বিজ্ঞান নির্ভর উন্নত দেশসমূহ কৃষিকার্যে যুগান্তকারী বিপ্লব সৃষ্টি করেছে । জমি কর্ষণ , বীজ বপন , সেচ কার্য , ফসল কর্তন , মাড়াই এবং বাছাইসহ সব কাজ এখন যন্ত্রের সাহায্যে সম্পাদন করা হচ্ছে । এখন আর সেচের জন্য কৃষককে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না । অনাবৃষ্টি বা অতিবৃষ্টি শস্য জন্মানাের অন্তরায় হয় না । জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে প্রয়ােজন অনুযায়ী সার দেওয়া এবং পােকা দমনের জন্য ঔষধ ছিটানাের কাজও যন্ত্রের সাহায্যে করা হয় । সফল কাটা যন্ত্রের সাহায্যে একদিকে ফসল কাটছে , অন্যদিকে মাড়াই হয়ে শস্য ও খড় আলাদা হয়ে যাচ্ছে । আধুনিক কৃষি কার্যে ব্যবহৃত যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে- শস্য ছেদনকারী মােয়ার , ফসল কর্তনকারী রপার , ফসল বাঁধার যন্ত্র বাইন্ডার , শস্য মাড়াই যন্ত্র থেশিং , সার ছিটানাের মেশিন ম্যানিউর স্প্রেডার প্রভৃতি । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , কানাডা , অস্ট্রেলিয়া , রাশিয়া প্রভৃতি দেশের খামারে একদিনে একশত একর পর্যন্ত জমি চাষ করা হচ্ছে মাত্র একটি ট্রাক্টরের মাধ্যমে । কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক অগ্রগতি সাধনে জাপান অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছ

Leave a Reply