নিরক্ষার দূরীকরণে ছাত্র সমাজের ভূমিকা

নিরক্ষরতা অর্থ অজ্ঞতা । যে ব্যক্তি লেখতে , পড়তে জানে না এবং উপযুক্ত বিবেচনা দ্বারা সঠিক কর্ম নির্বাচনে অজ্ঞ , তাকে বলা হয় নিরক্ষর । নিরক্ষরতা মানবজীবনে সবচাইতে বড় অভিশাপ । নিরক্ষরতার ফলে মানুষের জীবনে দেখা দেয় ব্যর্থতা , দুঃখ ও দৈন্য । এতে মানুষের জীবন অসুন্দর ও কুশ্রী হয়ে পড়ে । ফলে দেশ শিল্প , বাণিজ্য , কৃষি , শিক্ষাসহ সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে । বাংলাদেশে শতকরা আশি ভাগ লােকই নিরক্ষর । এ নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে জাতিকে অবশ্যই মুক্ত করতে হবে । নিরক্ষরতাই বাংলাদেশের অনগ্রসরতার মূল কারণ পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশে নিরক্ষরতা সবচেয়ে বেশি । সে কারণে আমাদের দেশ শিল্প , বাণিজ্যে , কৃষিতে সবার পিছনে পড়ে আছে । ফলে দেশের সব সমস্যা তথা অন্ন , বস্ত্র , বাসস্থান সবকিছুর জন্য অন্য । দেশের কাছে আমাদের হাত পাততে হচ্ছে । বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণই দরিদ্র এবং নিরক্ষর । যার ফলে সমাজে সুষ্ঠুভাবে বসবাসের জ্ঞান তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা সম্ভব হয় । । এতে করে দেশের মানুষ কুসংস্কারের গহ্বরে নিমজ্জিত থাকে যা জাতীয় অগ্রগতির পক্ষে বিরাট অন্তরায় । লেখতে , পড়তে জানে । বলেই এরা অন্যের উপর অধিক নির্ভরশীল ।

নিরক্ষার দূরীকরণে ছাত্র সমাজের ভূমিকা

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিরক্ষর জনগণ অসুবিধাজনক । কারণ , সৎ , যােগ্য ও শিক্ষিত জনশক্তি যা আমাদের নেই বলেই স্বাধীনতার ২৫ বছর পরও আমরা অনুন্নতই রয়ে গেছি । সামাজিক ক্ষেত্রে অশিক্ষিতের হার অধিকফলে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে । সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও আমরা নিরক্ষরতার কারণেই পিছিয়ে আজি । নিরক্ষরতার ফলে ব্যবসা – বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে । ফলে বুঝা যায় যে , দেশ সামাজিক , সাংস্কৃতিক , অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অার বোলল মি’রতার কারণেই ।

সমস্যার প্রকৃত রূপ

। বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা হয়ে প্রায় ৪৬,৮০০ । এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগ সরকার যারা পরিচালিত , আর বাকি বেসরকারি বিদ্যালয় । কিন্তু প্রায় ১৫ কোটি লােকের জন্য এ সংখ্যা পর্যাপ্ত নয় । তাছাড়া দারিদ্র্যের কারণে শতকরা ৩০ ভাগ শিশুই কোনাে বিদ্যালয়ে পড়তে যায় না । এবং অবশিষ্ট যে ৭০ ভাগ শিশু বিদ্যালয়ে যায় তাদের বিরাট এক অংশ – তৃতীয় , চতুর্থ শ্রেণিতে উঠার আগেই বিদ্যালয় ত্যাগ করে । ফলে প্রতি বছর দেশে নিরক্ষরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে , ।

নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে অভিযান

নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য সব পর্যায়ে ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার । এর জন্য প্রথমেই কােন শিশু ও বালক – বালিকাদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপক ব্যবস্থা করা । দেশের কোনাে শিশুই যাতে লেখাপড়ার সুযােগ । থেকে বঞ্চিত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে । এজন্য গ্রামে গ্রামে , শহরের প্রতি ওয়ার্ড এবং মহল্লায় প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন শাতে হবে । সেখানে বিনা খরচে সবার শিক্ষা লাভের সুযােগ থাকা উচিত । অনেক গরিব ছেলেমেয়ে দিনের বেলা জীবিকার্জনের কাজ করে । তাদের জন্য নৈশ বিদ্যালয় খুলতে হবে । এসব নৈশ বিদ্যালয়ে পৃথকভাবে নিরক্ষর বয়স্ক নারী পুরুষেরাও শিক্ষালাভ করতে পারবে । এছাড়া এক্ষেত্রে নিমলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে

  • সঠিক প্রচারের মাধ্যমে নিরক্ষর পিতা – মাতাকে শিক্ষার মূল্যবােধ সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে । প্রয়ােজনবােধে বয়স্ক শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের সাক্ষরজ্ঞান উপযােগী করে তুলতে হবে ।
  • দরিদ্র পিতামাতার মনে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও উৎসাহ সঞ্চারের জন্য প্রয়ােজনীয় ক্ষেত্রে লেখাপড়ার সাথে সাথে কিছু কিছু রোজগারের ব্যবস্থা করতে হবে ।
  • দেশের ছাত্র সমাজ , শিক্ষিত লােক , বিত্তবান সম্প্রদায় এবং বিভিন্ন সেবাধর্মী , সামাজিক সংগঠনকে , নিরক্ষরতা দূরীকরণে এগিয়ে আসতে হবে ।


নিরক্ষরতা দূরীকরণ অভিযানকে সাফল্যমণ্ডিত করে তােলার জন্য আরও অনেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পাস । এখন । কর্মক্লান্ত মানুষদের আনন্দের মধ্য দিয়ে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করলে তা অধিক ফলপ্রসূ হবে । এ উদ্দেশ্যে ম্যাজিক লণ্ঠন , সবাক চিত্র প্রদর্শন ইত্যাদির সাহায্য নেয়া যেতে পারে । শুধু তাই নয় , প্রচুর সুন্দর ছবিযুক্ত বর্ণ পরিচয়ের বই ছাপিয়ে বিনামূল্যে বিতরণ করলে তাতেও কাজ হতে পারে । জাতিসংঘের সমাজ , শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিভাগের একজন কর্মকর্তা ডক্টর লাওবাসের উদ্ভাবিত প্রণালী ইতােমধ্যেই বয়স্কদের শিক্ষাবিস্তারে খুব সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে । তিনি Key Word বা মূলশব্দ এবং Acture Word বা চিত্রশব্দ সম্বলিত বই তৈরি করে নিরক্ষরতা দূরীকরণের কাজকে সহজ করে তুলেছেন । এতে ছবি দেখার আনন্দের সাথে সাথে নিরক্ষর ব্যক্তি নতুন শব্দ পড়তে ও লেখতে শেখে । এভাবে একই সাথে বর্ণ পরিচয়ও হয়ে যায় এবং নিরক্ষর ব্যক্তি তাড়াতাড়ি সহজে বই পড়তেও শেখে । আমাদের বাংলা লেখন পদ্ধতি একটু জটিল । বর্তমানে যুক্তাক্ষরকে ভেঙে সহজ করে লেখার পদ্ধতি এবং স্বরচিহ্নের নানা জটিলতা দূর করা হয়েছে । তাছাড়া বাংলা বানানের ক্ষেত্রেও একটা একক রীতি প্রণয়ন করা হয়েছে , যাতে সবাই বুঝতে , শিখতে ও লেখতে পারদর্শী হয় । এমনি নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে নিরক্ষরতা দূরীকরণ সহজ হয়ে আসবে ।

Leave a Reply