পরিবেশ উন্নয়নে বৃক্ষরোপন

বৃক্ষ বা গাছ মানুষের পরম বন্ধু । সভ্য যুগের আগে থেকেই মানুষ গাছকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছে । যখন মানুষ অন জ্বালাতে শেখেনি , তখন গাছের ফল – মূল খেয়েই জীবনযাপন করেছে । যখন মানুষ ঘর বানানো  শেখেনি , তখন গাছের ছায়ায় নানা বিশ্রাম নিয়েছে । শিকার ধরার জন্য মানুষ গাছে আশ্রয় নিয়েছে । সভ্যতা গড়ে ওঠার আগে থেকেই মানুষ গাছ থেকে পেয়েছে জাক রক্ষাকারী ওষুধ । মানুষ গাছের কাঠ দিয়েই ঘরবাড়ি তৈরি করতে শিখেছে । জ্বালানি হিসেবে গাছকে কাজে লাগিয়েছে । এরপর সভ্যতা যতই এগিয়েছে মানুষের উপকারী বন্ধু হিসেবে গাছ মানুষকে আরও অনেক ক্ষেত্রে সহায়তা দিয়েছে । অথচ মানুষ এর প্রতিদান দিয়েছে খুব নির্মমভাবে । মানুষ গাছকে বন্ধু ভাবতে পারেনি । নির্বিচারে গাছ কেটে বনাঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে । এতে মানুষ নিজেদেরই ক্ষতি করছে । নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজন পরিমাণ মতো  বনাঞ্চল ।বৃক্ষের প্রকারভেদবৃক্ষ বলতে সাধারণত বড় গাছকে বুঝানো হয় । গাছ বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে ।

পরিবেশ উন্নয়নে বৃক্ষরোপন

বাংলাদেশের বনভূমিকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে ।

যথা-

( ক ) ক্রান্তীয় আর্দ্র চিরসবুজ ,

(খ ) ক্রান্তীয় আধা চিরসবুজ ,

(গ ) ক্রান্তীয় আর্দু পত্রমোচী ,

(ঘ ) জোয়ারধৌত বন এবং

(ঙ ) কৃত্রিম বন ।

এসব প্রকারের মধ্যে আছে ফলের গাছ , ঔষধি গাছ , ফুলের গাছ , ঝাউ গাছ , অ – ঔষধি গাছ । সুন্দরবন অঞ্চল আমাদের দেশের সুন্দরি কাঠের জন্য সুপরিচিত । এছাড়াও রয়েছে গজারি গাছ , কেওড়া ইত্যাদি গাছ ।

বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা

মানুষের জীবন রক্ষার্থে সবচেয়ে বেশি অবদান বৃক্ষের । বৃক্ষ থেকে নির্গত অক্সিজেন গ্রহণ করে আমরা বেঁচে আছি । আর আমাদের শরীর থেকে নির্গত বিষাক্ত কার্বন – ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে বৃক্ষ পরিবেশকে বিষমুক্ত করে । পরিবেশের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখে বৃক্ষ । প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত ঘটাতে বৃক্ষের অবদান রয়েছে । বাতাসের জলীয়বাষ্প ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে । এতে পরিবেশ ও আবহাওয়া থাকে নাতিশীতোষ্ণ ও হিমশীতল । মানুষের শরীর থাকে সুস্থ স্বাভাবিক । বৃক্ষ যেমন আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণে আনে , তেমনি প্রচুর বৃষ্টিপাতও ঘটায় । এতে মাটি উর্বর হয় , ফসল ফলে ভালো ।

কিন্তু মানুষ নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন করছে । এতে মানুষের জীবনধারণ ও পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে । ঝড় – তুফান , নদী ভাঙন বাড়ছে ; ফুল – ফলের পরিমাণ কমছে । সুতরাং আমরা বলতে পারি মানুষের জীবন বাঁচাতে ও পরিবেশ রক্ষার্থে বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম ।

বাংলাদেশে বনাঞ্চলের পরিমাণ

সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি আমাদের এই বাংলাদেশ । আমাদের জন্মভূমি পৃথিবীর একমাত্র জীবন্ত বদ্বীপ হিসেবে পরিচিত । আবার এই দেশেই রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন । এই বনে রয়েছে সুন্দরী গাছসহ অসংখ্য প্রজাতির গাছ । কিন্তু দিন দিন বৃক্ষ নিধনের মাত্রা বেড়েই চলেছে । এতে বনভূমি প্রায় ধ্বংসের পথে । একটি দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রযয়োজন ২৫ % বনভূমি । কিন্তু আমাদের দেশে বনভূমির পরিমাণ মাত্র ১৬.৪৬ % । মাথাপিছু বনের পরিমাণ ০.২২ হেক্টর । বনভূমি রক্ষার জন্য আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে এবং সরকারকে বিশেষ পদক্ষেপ ইহা তে হবে ।

মানবজীবনে সবচেয়ে বেশি উপকার করে বৃক্ষ । মানুষের জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উসের যোগান দেয় বৃক্ষ । তাছাড়া ঘর – বাড়ি আসবাবপত্রসহ মানবজীবনে প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই বৃক্ষ থেকে তৈরি করা হয় । জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করা হয় এবং আর্থিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৃক্ষের অবদান অপরিসীম ।

দুর্যোগ মোকাবিলায় বৃক্ষের অবদান

প্রায় প্রতিবছর বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকার দুর্যোগ হানা দেয় । বন্যা , ঘূর্ণিঝড় , সাইক্লোন , জলোচ্ছ্বাস , নদীভাঙন ইত্যাদি । এতে দেশের অনেক ক্ষতি হয় । অঞ্চল বিশেষে বিভিন্ন প্রকার বৃক্ষ সেখানকার পরিবেশ ও ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে , জমিকে ফসল ফলানোর উপযোগী করে তুলে । বৃক্ষ নদীভাঙন রক্ষা করে , ঘূর্ণিঝড়ের গতি কমিয়ে দেয় ; অনাবৃষ্টির হাত থেকে ফসলি জমিকে রক্ষা করে । তাছাড়া উপকূলীয় এলাকায় দুর্যোগ মোকাবিলায় বৃক্ষ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে । বৃক্ষনিধন ও তার প্রতিকার : বৃক্ষ মানুষের পরম বন্ধু হলেও প্রয়োজনে – অপ্রয়োজনে বৃক্ষ কাটা হচ্ছে । কেউবা জ্বালানির জন্য , কেউবা অর্থের প্রয়োজনে ; আবার কেউবা ঘর – বাড়ি ও আসবাবপত্র তৈরি করতে বৃক্ষ নিধন হচ্ছে । এতে বনজ সম্পদ কমছে । আমাদেরকে এই বৃক্ষনিধন বন্ধ করতে হবে । একটি গাছ কাটার সাথে সাথে দশটি গাছ লাগাতে হবে । ধ্বংস নয় সৃষ্টি— এমন মনোভাব নিয়ে বৃক্ষ রক্ষার্থে এগিয়ে আসতে হবে । তবেই পরিবেশ রক্ষার সহযোগীতা বনাঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব হবে ।

বৃক্ষরোপণ অভিযানে সরকারি উদ্যোগ

 ১৯৯৫ সালে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রায় ২০ কোটি চারা বিক্রয় ও বিতরণের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় । বিটিসি চলতি মৌসুমে প্রায় ৩ লাখ চারা বিনামূল্যে বিতরণ করে । কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা দেশের বিভিন্ন স্থানে ৭ হাজার চারা রোপণ করে । কুষ্টিয়া , মেহেরপুর , ভেড়ামারা , দিনাজপুরসহ কয়েকটি জেলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেও বনায়ন শুরু হয়েছে । বেশকিছু উদ্যোগী লোক বিভিন্ন রাস্তা , সেচ প্রকল্পের খাল ও বিভিন্ন জায়গা লিজ নিয়ে বৃক্ষরোপণ শুরু করেছেন । এরা অন্যান্য সুফলসহ আর্থিক দিক দিয়েও লাভবান হচ্ছেন । দেশের ব্যস্ত মহানগরগুলো সহ বিভিন্ন শহরের রাস্তাঘাট , ট্রেন লাইনসহ বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষরোপণ করা যায় । লায়ন্স , রোটারী ও লিও ক্লাবগুলো  সহ অন্যান্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বৃক্ষরোপণ অভিযানে সহায়তা দিচ্ছে । সেই থেকে প্রতিবছর সরকারি ও বেরসকারি উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ অভিযান চলে ।

Leave a Reply