পলিথিনমুক্ত পরিবেশ

পলিথিন এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ । এটি মারাত্মক বিষাক্ত প্রােপাইলিনের সঙ্গে পেট্রোলিয়ামের হাইড্রোকার্বনের, বিজ্ঞানের পরিভাষায় এর নাম পলিথাইলিন । অন্যান্য পদার্থের মতাে পলিথিন ভেঙে অন্য পদার্থে রূপান্তরিত হয় না । পলিথিনকে কোনাে অণুজীব মাইক্রোন অর্গানিজম খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে না । তাই এটি পড়ে না । পলিথিনের ব্যবহার এক সময় বাংলাদেশে পলিথিনের ব্যবহার ছিল ব্যাপক । দামে সস্তা ও সহজে বহনযােগ্য হওয়ায় বাংলাদেশে মানুষ খুব সহজে পলিথিনকে শপিং ব্যাগ হিসেবে গ্রহণ করেছিল । প্রায় ত্রিশ বছর আগে পলিথিনের ব্যবহার এত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল যে , প্রতিদিন প্রায় তিন কোটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহৃত হতাে । পলিথিনে বহনকৃত জিনিস সহজে পানিতে ভিজে না । তাই বৃষ্টির দিনে পলিথিন ছিল আরও বেশি জনপ্রিয় ।

পলিথিনমুক্ত পরিবেশ

পলিথিনের ক্ষতিকর দিক

পলিথিন আমাদের উপকার যতটুকু করছে ক্ষতি করছে তার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি । বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় , ঢাকা শহরেই প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহৃত হতাে । যার নব্বই ভাগ পলিথিন একবার ব্যবহারের পরই পরিত্যক্ত হয় । চিকিৎসকদের মতে , পলিথিনের ব্যবহার মারাত্মক রােগের সূত্রপাত ঘটায় । পলিথিন ব্যাগে রাখা খাবারের ওপর এর প্রভাব পড়লে সে খাবার গ্রহণে চর্মরােগ , ক্যান্সারসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি হয় । রঙিন পলিথিনে ব্যবহৃত ক্যাডমিয়ামের বিষাক্ত প্রভাবেও স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে । বৈজ্ঞানিকভাবে বলা হয় , পলিথিন বায় দূষণের অন্যতম কারণ । পলিথিন ভস্মীভূত করলে যে গ্যাস উৎপন্ন হয় সেই গ্যাস বায়ুকে বিষাক্ত করে তােলে । অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয় , পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করে পাটজাত ব্যাগ ব্যবহার করলে তা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে ।

পরিবেশের ওপর পলিথিনের প্রভাব –

মাটির অনুর্বরতা বৃদ্ধি

কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের এক গবেষণায় দেখা গেছে , মাটিতে পলিথিন ব্যাগ পড়ে থাকার কারণে মাটি তার উর্বরতা হারায় । কারণ , পলিথিন ব্যাগ মাটিতে ফেলে রাখলে তা প্রতি বছর ২/৩ ইঞ্চি করে মাটির নিচে চলে যায় এবং সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় থেকে যায় , যা মাটির পানিধারণে বাধার সৃষ্টি করে । মাটির মধ্যে থাকা পলিথিন বাতাস থেকে মাটির অভ্যন্তরে অক্সিজেন প্রবেশে প্রতিবন্ধকার সৃষ্টি করে । মাটির অভ্যন্তরে সূর্যের আলাে পৌছাতে বাধা দেয় । এতে মাটির উপকারী বিভিন্ন অণুজীবের মৃত্যু ঘটে । ফলে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয় । এছাড়াও পলিথিন উদ্ভিদের শিকড়ের চলার পথে বাধা সৃষ্টি করে উজিদের মত্য ঘটায় । জমিতে প্রয়ােগকৃত সারের বিস্তারেও পলিথিন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ।

পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি

শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থায় পলিথিন যেমন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে , তেমনি গ্রাম – গঞ্জের খাল বিল , নদী – নালায়ও এ দুচমটি করে থাকে । এক জরিপে দেখা গেছে , বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশে ৩/৪ ফুট পুরু পলিথিনের আন্তর পড়েছে । এর ফলে ড্রেজিং করা যাচ্ছে না । ড্রেজারের কাটারে বালির পরিবর্তে উঠে আসছে পলিথিন । গ্রামের নদী – নালা ও খাল – বিলের তলদেশেও প্রচুর পলিথিন জমা হয়ে পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে ।

পয়ঃনিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এক কর্মশালায় বলেছেন , পলিথিনের কারণে ঢাকা মহানগরীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে । ড্রেনের পাইপের মধ্যে মজে থাকা লক্ষ লক্ষ পলিথিন নগরীর স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার ২০ অকার্যকর করে ফেলেছে ।

বায়ু দূষণে পলিথিন

আমাদের দেশে পলিথিনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় পলি প্রােপাইলিন ও পলি ইখিনিল নামের দুটি রাসায়নিক পদার্থ । এ দুটি উপাদানই রিসাইক্লিং যােগ্য । দেশে মাত্র ২০ % পলিথিন পুনঃব্যবহার করা হচ্ছে । তাও এগুলো অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আগুনে পুড়িয়ে মণ্ড তৈরি করা হয় । আগুনে পােড়ানাের সময় এ থেকে বাতাসে কার্বন , কার্বন – ডাই অক্সাইড ও কার্বন মনােঅক্সাইড নির্গত হয় । তাছাড়া এর কালাে ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ বায়ুকে দূষিত করে । অন্যদিকে , পরিত্যক্ত পলিথিন ব্যাগের মধ্যে আটকে থাকা পচনশীল দ্রব্য ও পানি পচে বিভিন্ন রােগজীবাণুর সৃষ্টি হয় ও দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে পরিবেশকে বিপন্ন করে ।

পরিবেশ দূষণে পলিথিন

বাংলাদেশে পলিথিনের ব্যবহার এতই ব্যাপক ছিল যে , সবখানে ছিল পলিথিনের ছড়াছড়ি । মাই ঘাট , খাল – বিল , নদী – নালা , ড্রেন , পুকুর সবখানেই দেখা যেত পলিথিন । ড্রেনে , বাড়ির আনাচে – কানাচে পলিথিনের কারণে বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় । আর এই জলাবদ্ধতায় ময়লা – আবর্জনা জমে পচে দুর্গন্ধ বের হয় । জমা পানিতে বিভিন্ন পােকা ও মশার জন্ম হয় । এসব পােকা নানা রােগ সৃষ্টি করে । মশার কামড়ে ডেঙ্গু , ম্যালেরিয়া , ফাইলেরিয়ার মতাে বড় বড় রােগ সৃষ্টি হয় । এতে যেমন রােগের সৃষ্টি হয় , তেমনি পরিবেশ দূষিত হয় । আর এর জন্য দায়ী পলিথিন ।

অর্থনীতিতে পলিথিনের প্রভাব

পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় পাট ও চটের ব্যাগের ব্যবহার একেবারেই কমে গেছে । ফলে দেশে পাটের উৎপাদনও আকস্মিকভাবে আশঙ্কাজনকরূপে হ্রাস পেয়েছে । পাট শিল্পগুলাে লােকসানি শিল্পে পরিণত হয়েছে । এ শিল্পের সাথে হাজার হাজার শ্রমিক – কর্মচারী এবং চটের ব্যাগ , বাঁশ , বেতের সামগ্রী , কাগজের ব্যাগ ও ঠোঙা তৈরির সাথে জড়িত লক্ষ লক্ষ দরিদ্র মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে । এটা আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতি ।

পলিথিন নিষিদ্ধকরণে সরকারের উদ্যোগ

পলিথিন নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীপরিষদে প্রথমত নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । পরে পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওপর সেই দায়িত্ব অর্পিত হয় । পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রণালয় পর্যায়ক্রমে সারাদেশে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে । প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ঢাকা শহরে ১ জানুয়ারি ২০০২ থেকে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘােষণা করা হয় । পরে মার্চ ২০০২ থেকে সারাদেশে সরকার পলিথিনের ব

Leave a Reply