পুস্তক পাঠের আনন্দ

সৃষ্টির সেই উষালগ্ন থেকেই মানুষ নিজেকে ব্যক্ত ও ব্যাপ্ত করতে চেয়েছে চেয়েছে তার মহৎ ও বিচিত্র সৃষ্টিশীল উপলব্ধিকে দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে । সীমিত জীবনের মধ্যে অনন্ত জীবনের স্বরূপ অনুভবের আকাক্ষা মানুষের সহজাত প্রবণতা । সেই অনুভবের অন্তর্গত সাড়া নিয়ে যুগে যুগে শিল্পীরা রূপে , রঙে , ভাষায় , ছন্দে , ইঙ্গিতে , চিত্রে , সঙ্গীতে , চিত্রকল্পে , উপমা , অলংকরণে মূর্ত করে তোলেন তাদের বিচিত্র সৃষ্টি । পুস্তক হলো এসব সৃষ্টির মধ্যে সর্বাপেক্ষা মূল্যবান বস্তু । কেননা , বইয়ের অভ্যন্তরে আছে আলোয় ভরা কালো বর্ণের আনন্দলোক । মানুষের সুখ – দুঃখ , আনন্দ – বেদনার অনুভূতি নিজের বুকে নিয়ে অনাগত পাঠকের জন্য চির অপেক্ষমান হয়ে আছে বই । বইয়ের পাতায় জ্ঞানের মহাসমুদ্রের কল্লোল শোনা যায় । মানুষ তার আত্মার আত্মীয়ের তথা বিশ্ব মানবের সাহচর্য ও সঙ্গ লাভ করে গ্রন্থের মাধ্যমে । অনাদিকাল থেকেই গ্রন্থ পাঠে মানুষ অনাবিল শান্তি লাভ করে আসছে । প্রাজ্ঞ মনীষী ও সাহিত্য স্রষ্টাগণ যুগে যুগে পাঠকের হাতে সৃষ্টির অমৃত পাত্র তুলে দেন । পাঠক নির্বিকল্প রসানন্দে আবিষ্ট হন । আর সমুদয় পাঠকের রসাস্বাদনেই পুস্তক প্রণেতার সর্বৈব সার্থকতা ।

পুস্তক পাঠের আনন্দ

পুস্তক পাঠের উপকারিতা

 বিখ্যাত ঔপন্যাসিক তলস্তয় বলেছেন-

“ Three things are essential for life and these are books books and Books . ”

বই জ্ঞানের ভাণ্ডার , বোধের আধার , আনন্দের আনন্দলোক , মানবিক শুদ্ধতার শান্তিনিকেতন । পুস্তক পাঠে মানুষের মনে জাগে আনন্দ – বেদনার দার্শনিক সত্যবোধ । পুস্তক পাঠের প্রভাবেই মানবজীবন সুন্দর ও মহৎ হয়ে ওঠে । মানুষের মনে এনে দেয় নম্রভাব , সহানুভূতি , মায়া – মমতা , প্রেম – প্রীতির ভাব । যুগে যুগে গ্রন্থ দিয়েছে ত্যাগের দীক্ষা , করতে শিখিয়েছে সত্য ও সুন্দরের সাধনা । প্রকৃতপক্ষে মনের ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে সহজ পন্থাই হলো পুস্তক পাঠ । পুস্তক পাঠ মানুষের দৃষ্টিকে উদার করে , মনকে করে উন্নত । দুঃখ – কষ্ট , শোকে – তাপ , হতাশা , অবসাদ , দ্বন্দ্ব – সংঘাতপূর্ণ পৃথিবীতে পুস্তক পাঠেই মানুষ স্বর্গীয় আনন্দ লাভ করতে পারে । তাই অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন “ বই পড়াকে যে যথার্থ হিসেবে নিতে পারে , সংসারের দুঃখ – কষ্টের বোঝা তার অনেকখানি কমে যায়

তার মধ্যে গ্রন্থ পাঠ আনন্দ লারে শ্রেষ্ঠ পথ হিসেবে বিবেচিত । ভিম কাট বলেছে-

‘‘When we buy a book we bury pleasure ’’

পুস্তক পাঠ মানুষের কর্মক্লান্ত দিনের ব্যস্ততা  

মধ্যে পড়িত চিত্রে কান্তি দূর করে এনে দেয় অনাবিল প্রশান্তি । গ্রন্থ মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু । জীবনের নানাবিধ আভিত আমাদের যখন উন্মত্ত কত্রে তেলে তখন আমরা সানা , সহানুভূতি ও আনন্দের জন্য ছুটে চলি গ্রন্থাগারের দিকে । পুস্তরে S !! হতে তার্ত চোখে পান করি আনন্দলো অমৃত ; শান্ত – শীতল করি অশান্ত – উত্তণ্ড অন্তর । না ঘাত – প্রতিঘাতে মানুষ যখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে , হতাশার চোরাবালিতে ডুবে যায় , তখন সেই বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে , হতাশা থেকে মুক্তি দিতে পারে একটি ভালো বই । মানুষের উচ্চতর বৃত্তিগুলো চায় সত্য , জ্ঞান ও আনন্দের আলো । আর বই সত্য ও জ্ঞানের সন্ধান দিতে , আনন্দলোক সৃষ্টি তে সর্বাধিক সাহায্য করে থাকে । বই সত্য ও আলোর পথ দেখিয়ে ব্যক্তিকে বিশুদ্ধ করে গড়ে তোলে । পুস্তক পাঠে আনন্দ প্রসঙ্গে মনীষী বারট্রান্ড রাসেল বলেছেন সংসক্সের জ্বালা – যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে মনের ভেতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদকালে তার ভেতর ডুব দেওয়া । যে যত বেশি ভুবন সৃষ্টি করতে পারে , ভবন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তার ততই বেশি হয় । ” সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায় বই : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন , “ মানুষ বই দিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে সাঁকো বেঁধে দিয়েছে । ” গ্রন্থের সাহচর্যেই মানুষ অগ্রসর হয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্রম – অগ্রগতির পথে । আমাদের বৃহত্তর জীবনের যাত্রাপথের সবচেয়ে বড় সঙ্গী এবং শক্তিশালী সম্পদ হোল বরেণ্য মনীষীদের লেখা মূল্যবান বই । এসব বই পড়েই আমরা তাদের মহৎ চিন্তা চেতনা ও বৃহৎ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচিত হতে পারি ।

গ্রন্থ পাঠের প্রয়োজনীয়তা

বিশ্বের সঙ্গে যোগাযেগের উত্তম উপায় বই । সমগ্র বিশ্বকে জানতে হলে গ্রন্থ পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য । গ্রন্থপাঠের । মাধ্যমেই আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের সান্নিধ্য লাভ করতে পারি । মানুষের জ্ঞান – বিজ্ঞান , শিল্পকলা ও সাহিত্য সাধনার নীরব সাক্ষী । ১১৫৪ প্রবন্ধ রচনা 1 বিশ্বের অজস্র গ্রন্থ । গ্রন্থপাঠ অতীত , বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলে । অতীতের ঐতিহ্য নানা সৎ – অসৎ চিন্তার অনুশীলন ও বিচিত্র ভাবধারা নিহিত রয়েছে গ্রন্থরাজিতে । তাই বিচিত্র জাতি , দেশ ও সমাজের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য গ্রন্থের সাহায্য ছাড়া গত্যন্তর নেই । মনের স্বাস্থ্যবিকাশে পুস্তক পাঠ : দেহ আর মন নিয়েই মানুষ । দেহের পুষ্টির জন্য যেমন খাদ্যের প্রয়োজন , তেমনি মনের স্বাস্থ্যের জন্য মানসিক খাদ্য অপরিহার্য । মনের খাদ্য আহরণ করতে হয় রূপ – রসের আনন্দবাজার থেকে । মনের ঐশ্বর্যের গুণেই মানুষ মহৎ হয় , হয় মৃত্যুঞ্জয়ী । পুস্তক হলো সেই আনন্দ – ঐশ্বর্যের গনি । মনের খাদ্য তাই প্রত্যক্ষ গোচর নয় , তা অনুভবের বিষয় , উপলব্ধির ব্যাপার । সেই ভাব – উপলব্ধির সৌন্দর্য সমগ্র জীবনেই ব্যাপ্ত হয়ে পড়ে । মহৎ বইয়ের প্রভাবে , তাতে অভিব্যক্ত ব্যঞ্জনার অনুরণনে , সত্যের দ্বার মুক্ত হওয়ায় আমরা হৃদয়ের দ্বারা হৃদয়ের যেগ অনুভব করি । পুস্তক যুগে যুগে মানুষকে দিয়েছে মহৎ ও উন্নত জীবনের দীক্ষা ।

Leave a Reply