বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকট ও তার প্রতিকার

বস্তুত বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে যেদিন তার অসাধারণ প্রতিভা দিয়ে আকাশের মেঘে ঢাকা বিদ্যুৎ এনে দিয়েছেন মানুষের হাতের মুঠোয় , সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল আলােকিত আধুনিক সমাজ নির্মাণের জয়যাত্রা । বিজ্ঞানের জাদুকরী আবিষ্কার বিদ্যুৎশক্তি অন্ধকারে বন্দিনী পৃথিবীর অমানিশা দূর করেছে । বিদ্যুই আধুনিক সভ্যতাকে পৌঁছে দিয়েছে শব্দাতিরেক যুগে এবং জৈবপ্রযুক্তির অসীম সম্ভাবনাময় যুগের দ্বারপ্রান্তে । তাই আধুনিক সভ্যতার চালিকাশক্তি বিদ্যুৎকে বাদ দিয়ে অগ্রগতির কথা চিন্তাই করা যায় না । অথচ যান্ত্রিক সভ্যতার যুগেও দেশের উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি বিদ্যুৎ শক্তির উৎপাদন সমস্যার আবর্তে বাংলাদেশ আজও ঘুরপাক খাচ্ছে । এ সমস্যার আশু সমাধান একান্ত দরকার ।

বিদ্যুৎ সংকট ও তার প্রতিকার

বিদ্যুৎ সংকট বলতে যা বুঝায়

বিদ্যুৎ সংকট বলতে বুঝায় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের অপ্রতুলতা এবং বিদ্যুৎ প্রাপ্তিতে নানামুখী অনিয়ম , হয়রানি ও দুর্নীতি । চাহিদার তুলনায় উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ কম হলে দিনের কিছু সময় গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ থেকে বঞ্চিত রাখা হয় । একে বলা হয় ‘ লােড শেডিং ’ বা বিদ্যুৎ বিভ্রাট । অপরদিকে , জরাজীর্ণ বিদ্যুৎ লাইন , দুর্ঘটনা , সংযােগ প্রাপ্তিতে হয়রানি , বিল আদায়ে অনিয়ম , চোরাই বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রভৃতি কারণে বিদ্যুৎ খাতে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে থাকে , যাকে এক – কথায় বিদ্যুৎ সংকট বলে নির্ণয় করা হয় । উন্নত বিশ্বের উন্নত দেশসমূহে বিদ্যুৎ সমস্যা নেই । সেসব দেশে বড়জোর বছরে দু’চার বার পাঁচ / দশ মিনিট বিদ্যুৎ সংকট সৃষ্টি হয় । এতেই বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জনগণের নিকট জবাবদিহিতার সম্মুখীন হন । বিশেষ করে শিল্পোন্নত দেশের প্রাণশক্তি হলাে বিদ্যুৎ । বিদ্যুৎ সংকট সৃষ্টি হলে শিল্পের উন্নতি ও উৎপাদন বিঘ্নিত হয় । তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , যুক্তরাজ্য , জাপান , ইতালি প্রভৃতি দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি তাে নেই – ই , বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়ে থাকে ।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট

বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট অত্যন্ত প্রকট । সাম্প্রতিক বছরগুলােতে বাংলাদেশে ক্রমাগুয়ে জ্বালানি চাহিদা বেড়েছে । উৎপাদনশীল খাতের পাশাপাশি আর্থিক খাতে গতি সঞ্চার ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা সচল রাখতে দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে গড়ে ৮ হাজার মেগাওয়াট । অথচ সেখানে গড় উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াট । কাজেই মােট গড় ঘাটতির পরিমাণ ৩ হাজার মেগাওয়াট । যে কারণে শিল্প খাতে বা গৃহস্থালি খাতে লােডশেডিং অনিবার্য হয়ে আছে । তাছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলাে বহু বছরের পুরানাে হওয়ার কারণে এগুলাের উৎপাদন ক্ষমতা প্রতিনিয়ত হাস পাচ্ছে । এমনকি , কোনাে কোনাে কেন্দ্রে উৎপাদন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় । তখন লােডশেডিংয়ের পরিমাণ আরও বেড়ে যায় এবং শিল্প উৎপাদন , বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে , জনজীবনে অসহনীয় বিপর্যয় নেমে আসে ।

বিদ্যুৎ সংকটের নেতিবাচক প্রভাব

বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যাচ্ছে । অর্থনীতিতে যে সম্ভাবনা আছে , সেটি অর্জিত হচ্ছে না । নতুন বিনিয়ােগও হচ্ছে না । যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু আছে সেগুলােও তার পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না । অপ্রতুল জ্বালানি সরবরাহের কারণে শিল্প – কারখানাগুলাের উৎপাদন প্রায় ৫০ ভাগ কমে গেছে । বিনিয়ােগের চিত্র খারাপের দিকে যাচ্ছে । বিনিয়ােগ বাের্ড এবং বাংলাদেশ ব্যাংক – এর হিসাব অনুযায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে বিদেশি বিনিয়ােগ এসেছিল ৫০ কোটি ২০ লাখ ইউএস ডলার । ২০১৫ সালে তা নেমে এসেছে ২৫ কোটি ৯০ লাখ ডলারে । বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশের মতাে ক্ষতি হচ্ছে । বিদ্যুৎ ও গ্যাস ঘাটতির জন্য প্রত্যক্ষ এবং পরােক্ষভাবে দেশের ক্ষতি হচ্ছে ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি । এর মধ্যে বিদ্যুৎ ঘাটতির জন্য উৎপাদনে ক্ষতি বছরে ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা । এছাড়াও বিদ্যুতের অভাবে শহর – মফস্বল ভূতুড়ে পল্লিতে পরিণত হয় । অপহরণ ও ছিনতাই বৃদ্ধি পায় । এতে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে দুর্বিসহ দুর্বিপাক ।

বিদ্যুৎ সংকটের যথার্থ কারণ

বিদ্যুৎ সংকটের প্রধান কারণ হলাে মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা বৃদ্ধি । বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ে গাণিতিক হারে কিন্তু এর চাহিদা বৃদ্ধি পায় জ্যামিতিক হারে , তাই বিদ্যুৎ সংকট সামাল দেওয়া সত্যিই কষ্টকর হয়ে পড়েছে । বাংলাদেশের মারাত্মক বিদ্যুৎ সংকটের নানা কারণের মধ্যে তিনটি প্রধান কারণ হলাে- অস্থিতিশীল রাজনীতি , বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং সিস্টেম লস । সিস্টেম লস বিষয়টি আসলে ‘ চুরি ‘ । বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলাে অবৈধভাবে গ্রাহকের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে , মিটার জালিয়াতি করে ওই গ্রাহকের ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ব্যয়ের পরিমাণ কম দেখায় । ফলে সরকারের খাতে কম বিল জমা পড়ে । তাছাড়া দাপ্তরিক হিসাবের বাইরে অবৈধ সংযােগ দেওয়া তাে আছেই । এভাবে বিল কমিয়ে দেখানাে ও অবৈধ সংযােগ দেয়ার মাধ্যমে প্রতি বছর যে কোটি কোটি টাকা লােকসান হয় তা – ই হলাে সিস্টেম লস । এছাড়াও বিদ্যুৎ সংকটের অন্যান্য কারণগুলাে নিচে তুলে ধরা হলাে :

  • প্রয়ােজনীয় কাঁচামাল ও উচ্চমানের কয়লা সরবরাহের অভাব ।
  • ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার সঙ্গে সে – হারে বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপন না হওয়া ।
  • কারিগরি অদক্ষতা , অবহেলা এবং বহু পুরাতন যন্ত্র ও সাজসরঞ্জামের আবশ্যিক সংস্কারের কাজে কর্তৃপক্ষের সময়ােচিত ব্যবস্থা গ্রহণে অক্ষমতা ।

Leave a Reply