বাংলাদেশ পেশাক শিল্প

প্রাচীন বাংলার পােশাক শিল্পের ব্যাপক চাহিদার কথাই ঘােষণা করে । কিন্তু বেনিয়া ব্রিটিশদের চক্রান্তে সাময়িকভাবে তা থেমে গিয়েছিল । আবার দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এ শিল্পই বৃহদায়তন শিল্প হিসেবে স্বদেশের চাহিদা মিটিয়ে আজ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে । ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে এর রপ্তানির পরিমাণ । বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ খাতে অবদান বেশ উৎসাহব্যঞ্জক ।

বাংলাদেশ পেশাক শিল্প

পেশাক শিল্পের অতীত ও বর্তমান অবস্থা

তৈরি পােশাক বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাত হিসেবে স্বীকৃত । তবে স্বাধীনতার পূর্বে ও পরে পােশাক শিল্প খাত সম্পর্কে ব্যবসায়ী মহলে তেমন কোনাে উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল না । এদেশে মূলত ১৯৭৬ সাল থেকে পােশাক শিল্পের যাত্রা শুরু । ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতাে তৈরি পােশাক রপ্তানি শুরু হয় । ৮০’র দশকে এ খাত বিস্ময়কর উন্নতি সাধন করে । বর্তমানে এ খাত দেশের অর্থনীতি , বৈদেশিক বাণিজ্য এবং মহিলা শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী সর্ববৃহৎ খাত হিসেবে চিহ্নিত । ফলে এ খাত গড়ে প্রতি বছর ২১.৫৩ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে । দ্রুত বিকাশমান এ খাত থেকে রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭৫ % অর্জিত হচ্ছে ।

পােশাকের বাজার

বাংলাদেশ বিশ্বের প্রায় ২০ টিরও অধিক দেশে পােশাক রপ্তানি করছে । বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পােশাকের অন্যতম ক্রেতা । শুধু যুক্তরাষ্ট্রে পােশাক রপ্তানি করে মােট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৫৬ % অর্জিত হয় । দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার হচ্ছে ইউরােপীয় ইউনিয়ন তথা জার্মানি , ফ্রান্স , ইতালি , কানাডা , ইংল্যান্ড , মধ্যপ্রাচ্যসহ ই , সি , ভুক্ত দেশগুলাে । পােশাক শিল্পে বর্তমানে প্রায় ৮৪ টি ক্যাটাগরি আছে । তন্মধ্যে বাংলাদেশ ৩৬ টি ক্যাটাগরি উৎপাদন করে থাকে , যার মধ্যে ১৮ টি ক্যাটাগরি কোটাভুক্ত এবং বাকি ১৮ টি ক্যাটাগরি কোটা বহির্ভূত ।

অর্থনীতিতে অবদান

দেশের উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি বিশেষ করে মহিলা শ্রমিককে কাজে লাগিয়ে পােশাক শিল্প দেশের সার্বিক শিল্পায়নে গতি সৃষ্টি করেছে । এ শিল্পের দ্রুত ক্রমবর্ধমানতার কারণে দেশে একদল উদ্যোক্তা শ্রেণি সৃষ্টি হয়েছে । যারা অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখছে । এ শিল্পে বর্তমানে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মরত রয়েছে । ফলে জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশের অর্থনৈতিক যােগান দিচ্ছে পােশাক শিল্প , যার ফলে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়ােজনীয় বিবিধ দ্রব্যসামগ্রী , যেমন প্রসাধনী , জুতা , খাদ্য ইত্যাদির বাজার সৃষ্টি হচ্ছে । এ শিল্পের একটি অতি প্রয়ােজনীয় উপাদান হচ্ছে তরল অর্থ । তাই ব্যাকি ব্যবসায়ে ক্রমশ খুলে যাচ্ছে বিস্তৃত দ্বার । এ শিল্পের বিকাশের কারণে সড়ক ও বিমান পথের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে এক বিশাল দিগন্তের । বর্তমানে অনেক স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান পােশাক শিল্পের সহায়ক শিল্প যেমন— কার্টন , পলি প্যাকেট , সুতা , বােতাম , পলিব্যাগ , লেবেল , নেকবাের্ড ইত্যাদি উৎপাদনে এগিয়ে এসেছে । ফলে দেশের অর্থনীতিতে উন্নতির ছোঁয়া লাগছে , যা নিঃসন্দেহে আমাদের দেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশের জন্য ইতিবাচক ।

পােশাক শিল্পের সমস্যা

বর্তমানে ১০০ % রপ্তানিমুখী তৈরি পােশাক শিল্প পড়েছে গভীর সংকটে । গার্মেন্টস শিল্পে এ অনিশ্চয়তা প্রথমত শুরু হয় ২০০৫ সাল থেকে এমএফএন কার্যকরী ও জিএসপি বন্ধের কারণে । এর ফলে গােটা শিল্পে নেমে আসে স্থবিরতা । ব্যবসায়ীরা হয়ে পড়েন উদ্বিগ্ন । তাছাড়া ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে হামলার প্রেক্ষিতে অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী মন্দা , বাজার সংকুচিত হওয়া , পণ্যমূল্য কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণে গার্মেন্টস শিল্প কিছুটা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল । আন্ত র্জাতিক বাজারে পােশাকের মূল্য নিয়েও সমস্যা দেখা দেয় । বাজারে প্রবল প্রতিযােগিতায় বিভিন্ন ওভেন পােশাকের মূল্য কমে যায় । সচল কারখানাগুলাে তাদের উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশ তখন কাজে লাগাতে পারছিল । গার্মেন্টস শিল্পে অপচয়ও একটি বড় সমস্যা ছিল । অদক্ষতা এবং অপচয় রােধ করার মতাে কারিগরি জ্ঞানের অভাবে এসব শিল্প কম মূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারে সুবিধা তে পারেনি । অথচ উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে অপচয় কমিয়ে আনতে পারলে পণ্যমূল্য কমিয়েও বাজার ধরে রাখা সম্ভব । ২০১৩ ; সালে পােশাক শিল্পখাতে ভয়াবহ কয়েকটি দুর্ঘটনার জের ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে পােশাক আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রত্যাহার করে নিয়েছে । বাংলাদেশ এই সুবিধা পেতে এখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ।

সমস্যা সমাধানের উপায়

বর্তমানে পােশাক শিল্পের সমস্ত সমস্যা থেকে আমাদের উত্তরণের উপায় খুঁজতে হবে । সরকারি নগদ সহায়তার ১০০ ভাগ অবমুক্তকরণ এবং তা সময়মতাে উদ্যোক্তাদের হাতে পৌছাতে হবে । ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ প্রতিষ্ঠা , বিশেষ করে তুলা , সুতা ও বস্ত্র উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের উদ্যোগ নিতে হবে । বাণিজ্যনীতি ও শিপিং খাত সংস্কার করতে হবে । সার্ক কিউমুলেশন বাস্তবায়ন ও দেশে সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যার হাউস চালু করতে হবে । পণ্যের মান বাড়ানাের পাশাপাশি অপচয় কমিয়ে পণ্যমূল্য কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে । কারিগরি জ্ঞান ও বাণিজ্য নেগােসিয়েশনের দক্ষতা বাড়াতে হবে । কোটা বরাদ্দ কমিটিতে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সরকারি প্রতিনিধি বাড়ানাের সিদ্ধান্ত নিতে হবে । কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নগদ সহায়তা সংক্রান্ত রীতি – নীতি শিল্প উদ্যোক্তাদের অনুকূলে নিয়ে আসতে হবে । লিড – টাইম কমিয়ে আনার ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে । গার্মেন্টস শ্রমিক , বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের সুযােগ – সুবিধা বাড়াতে হবে । তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে । রুগ্ন শিল্প পুনরুজ্জীবনে সহায়তা এবং সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে । সর্বোপরি , রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ অর্জনকারী এ শিল্পের এখন প্রয়ােজন । সার্বিক সংস্কার । সরকার , উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট সকলে মিলে যদি সময় মতাে সিদ্ধান্ত না নেন তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এটিও পাট শিল্পের মতাে ইতিহাস হয়ে যেতে পারে ।

Leave a Reply