ভূমিকম্প সবচেয়ে ভয়াবহ

প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ভূমিকম্প সবচেয়ে ভয়াবহ । ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশে বার বার আঘাত হানে । প্রতিবছরই কোনাে না কোনাে দুর্যোগ বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রাকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে । বিভিন্ন সূচকের মানদণ্ডে বিজ্ঞানীরা এসবের নাম দিয়ে থাকে । বন্যা , সাইক্লোন , টর্নেডাে , ঘূর্ণিঝড় , জলােচ্ছাস , খরা , নদীভাঙন ইত্যাদি ব্যাপক বিধ্বংসী এ সকল অনাহুত জঞ্জাল যেন বাংলাদেশের পিছু ছাড়ছেই না । তারপর আবার বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাড়িয়েছে ভূমিকম্প । বিগত কয়েক বছর ধরে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে অনেক বার । তাই আমাদেরকে ভূমিকম্পজনিত ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে বাঁচার জন্য জাতীয় ভিত্তিক প্রস্তুতি নিতে হবে , অন্যথায় যেকোনাে মুহূর্তে জাতিকে চরমমূল্য দিতে হবে ।

ভূমিকম্প সবচেয়ে ভয়াবহ

ভূমিকম্প হলো ভূ – অভ্যন্তরে বিপুল শক্তি উদগীরণের ফলে এক প্রকার কম্পনের সৃষ্টি হয় । হঠাৎ করে এই শক্তির মুক্তি ঘটলে ভু – পৃষ্ঠ ক্ষণিকের জন্য কেঁপে ওঠে এবং ভূ – ত্বকের কিছু অংশ আন্দোলিত হয় । এই রূপ আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী কম্পনকে ভূমিকম্প ( Earthquake ) বলে । ভূ – পৃষ্ঠের কম্পন তরঙ্গ থেকে যে শক্তির সৃষ্টি হয় ভূ – মণ্ডলে তা ভূমিকম্পের মাধ্যমে প্রকাশ পায় । সমুদ্রপৃষ্ঠে এ তরঙ্গ সৃষ্টি হলে তাকে সুনামি বলে । এই তরঙ্গ ভূ – গর্ভের কোনাে অঞ্চলে উৎপন্ন হয় এবং তা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে । এ কম্পন মাত্র কয়েক সেকেন্ড থেকে এক / দুই মিনিট স্থায়ী হয় । শক্তিশালী ভূমিকম্পে ঘর – বাড়ি , সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং অসংখ্য প্রাণহানি । ঘটে ।

ভূমিকম্পের কেন্দ্র

পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেখান থেকে ভূ – কম্প – তরঙ্গ উৎপন্ন হয় , তাকে ভূমিকম্পের কেন্দ্র বলে । এই কেন্দ্র থেকে কম্পন ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গের মাধ্যমে সব দিকে ছড়িয়ে পড়ে । শিলার পীড়ন – ক্ষমতা সহ্যসীমার বাইরে চলে গেলে শিলায় ফাটল ধরে ও শক্তির মুক্তি ঘটে । তাই প্রায়শই ভূমিকম্পের কেন্দ্র চ্যুতিরেখা অংশে অবস্থান করে । সাধারণত ভূ – পৃষ্ঠ থেকে ১৬ সি . মি . – এর মধ্যে এই কেন্দ্র অবস্থান করে । তবে ৭০০ কি . মি . গভীরে গুরুমণ্ডল ( Mantle ) থেকেও ভূ – কম্পন উথিত হতে পারে ।

ভূ – পৃষ্ঠজনিত

আমাদের ভূ – পৃষ্ঠ অনেকগুলাে প্লেট এর সমন্বয়ে গঠিত । এই প্লেটগুলাে একটি আরেকটির থেকে আলাদা থাকে ফন্ট বা ফাটল দ্বারা । এই প্লেটগুলাের নিচেই থাকে ভূ – অভ্যন্তরের সকল গলিত পদার্থ । কোনাে প্রাকৃতিক কারণে এই গলিত পদার্থগুলাের স্থানচ্যুতি ঘটলে প্লেটগুলােরও কিছুটা স্থান চ্যুতি ঘটে । এ কারণে একটি প্লেটের কোনাে অংশ অপর প্লেটের তলায় ঢুকে যায় , যার ফলে ভূমিতে কম্পন সৃষ্টি হয় । আর এই কম্পনই ভূমিকম্প রূপে আমাদের নিকট প্রতিভাত হয় ।

আগ্নেয়গিরিজনিত কখনাে কখনাে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ও গলিত লাভা উৎক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হতে পারে ।

শিলাচ্যুতিজনিত কখনাে কখনাে শিলা তার স্থান থেকে সরে যাওয়ার ফলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয় ।

ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ কেন

বাংলাদেশের ভূমিকম্প বলতে আসলে বাংলাদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকার ভূমিকম্পকে বােঝায় । কারণ বাংলাদেশ আসলে ভারত ও মায়ানমারের ভূ – অভ্যন্তরের দুটি ভূ – চ্যুতির ( faultline ) প্রভাবে আন্দোলিত হয় । কেননা বাংলাদেশ । ভারতীয় ইউরেশীয় এবং বার্মার ( মায়ানমারের ) টেকটনিক প্লেটের মধ্যে অবস্থান করছে । ভারতীয় এবং ইউরেশীয় প্লেট দুটি ( ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে ) দীর্ঘদিন যাবত হিমালয়ের পাদদেশে আটকা পড়ে আছে , অপেক্ষা করছে বড় ধরনের নড়াচড়ার অর্থাৎ বড় ধরনের ভূ – কম্পনের । বাংলাদেশে ৮ টি ভূ – তাত্ত্বিক চ্যুতি এলাকা বা ফল্ট জোন সচল অবস্থায় রয়েছে । যথা– বগুড়া চ্যুতি এলাকা , রাজশাহীর তানোের চ্যুতি এলাকা , ত্রিপুরা চ্যুতি এলাকা , সীতাকুণ্ড – টেকনাফ চ্যুতি এলাকা , হালুয়াঘাট চ্যুতি এলাকা , ডাউকী চ্যুতি এলাকা , ডুবরি চ্যুতি এলাকা , চট্টগ্রাম চ্যুতি এলাকা , সিলেটের শাহজীবাজার চ্যুতি এলাকা ( আংশিক – ডাওকি চ্যুতি ) এবং রাঙামাটির বরকলে রাঙামাটি চ্যুতি এলাকা ।

ভূমিকম্পের পূর্বপ্রস্তুতি

  • গবেষকদের প্রকাশিত তথ্যমতে আপনি কী পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আছেন তা জেনে নিন ।
  • আপনি যে ভবনটিতে আছেন সেই ভবনটি ভূমিকম্পরােধক কি না খোঁজ নিন । থাকলে কত মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় এবং থাকলে এত দুর্বল ভবনে রেট্রোফিটিং এর ব্যবস্থা নিন ।
  • পরিবারের সবার সাথে বসে আশ্রয়ের ব্যাপারে পরিবারের ইমার্জেন্সি প্ল্যান ঠিক করুন ।
  • বিছানার পাশে সবসময় টর্চলাইট , ব্যাটারি ও জুতাে রাখুন ।
  • প্রতি বছর পরিবারের সকলের সাথে ভূমিকম্পের করণীয় সম্পর্কে ট্রায়াল দিন ।

ভূমিকম্পের সময় করণীয়

  • ভূমিকম্প শুরু হলে ছুটাছুটি না করে স্থির থাকুন । বাইরে বের হওয়া , ছাদ বা জানালা দিয়ে লাফ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন ।
  • ভূমিকম্প শুরু হলে মেঝেতে বসে পড়ুন । তারপর কোনাে ডেস্ক বা টেবিলের নিচে প্রবেশ করুন ।
  • ভবনে ভূমিকম্পরােধক ব্যবস্থা থাকলে ভবন ধসের সম্ভাবনা কম থাকে । সুতরাং তখন ভবনে অবস্থান করাই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ।
  • ভূমিকম্পের সময় এলিভেটর / লিট ব্যবহার করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ । সুতরাং এলিভেটর / লিট ব্যবহার পরিহার করুন ।
  • ভূমিকম্পের সময় গাড়িতে থাকলে গাড়ি বন্ধ করে ভিতরে বসে থাকুন । গাড়ির বাইরে বের হলে আহত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে ।

Leave a Reply